মাথার ভেতরে জন ডেনভার

হঠাৎ রাতে ঘুম ভেঙে যায়। বারান্দার দরজাটার বাইরেই প্রচন্ড ঝড়ের তান্ডব। কংক্রিটের শহরে ঝড় বৃষ্টি সাধারণত তেমন একটা বোঝা যায় না। কিন্তু এই রাতের দ্বিতীয় প্রহরে দরজায় বাতাসের শব্দ আর হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে যাওয়া ঘর থেকে ভালই বোঝা যায় ঝড়ের প্রচন্ডতা।

খুব ইচ্ছে করে উঠে বারান্দার দরজাটা খুলতে। ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে বৃষ্টির অবিরাম ধারা।
কিন্তু কি যেন কি হয়! বৃষ্টি হলেই যে আচ্ছন্ন হয়ে যাই।

বাইরে বৃষ্টিধারা বয়ে যায় অবিরাম। বৃথাই চেষ্টা করে যায় তোমাকে ভুলিয়ে দিতে। মাথার ভেতরে জন ডেনভার নিয়ে হারিয়ে যাই, তোমারই ভাবনায়।

 

একটা সন্ধ্যা

অনেক দিন পর আজ বৃষ্টির সাথে দেখা। হঠাৎ করেই এসে সামনে হাজির। তার এমন অপরূপ রূপ বহুদিন হল দেখি না। আজকাল তার সাথে দেখাই হয় না। খবরই রাখিনা কখন এসে সে ফিরে চলে যায়। আসলেই অনেক বদলে গেছি আমি। তাইতো এত নিষ্ঠুর হতে পারি! তোমায় বলেছিলাম না, বৃষ্টি আমার প্রথম প্রেম। আমি তোমাকে বলেছিলাম, সে আমাকে সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসে।

হতে পারে অনেক নিষ্ঠুর হয়ে গেছি আমি। ভেতরটা পাথর হয়ে গেছে। কিন্তু তারপরও আজ যখন ওকে দেখলাম মনটা কেমন যেন করে উঠল। কেন বলতো? আমার তো বিচলিত হবার কথা না!! কিন্তু ওকে দেখেই ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা পাগলটা যেন লাফিয়ে উঠল! এতদিনের সাধনায় পাগলটাকে ঘুম পাড়িয়েছিলাম!! কিন্তু ওর একটা ডাকেই সে জেগে উঠল!

জান? আজ অফিস থেকে বের হবার সাথে সাথেই ধুলি মেশানো দমকা বাতাসটা যখন ধাক্কা দিল, তখনই মনটা কেমন যেন করে উঠেছিল। সবকিছুই যেন ছিল একদম গোছানো! আজ আমার সাথে তার দেখা হবার জন্য!! গুলশান নেমে যখন রিকশাওয়ালাকে ভাংতির অভাবে ভাড়া দিতে পারছিলাম না, তখন একটুও বিরক্ত লাগেনি। নিজে থেকেই দোকানে গেলাম ভাংতি করতে!!! তুমি ভাবতে পারো? আমি ফুরফুরে মনে রিকশাওয়ালার জন্য টাকা ভাংতি করতে জাচ্ছি? যখন দোকানীটা টাকা গুনে দেওয়ার সময় গল্প করে আমার দেরি করিয়ে দিচ্ছিল, তখনো বিরক্ত হইনি! মজা করে তার গল্প শুনছিলাম! যেন কোনই তাড়া নেই আজ আমার!

তখনও কি জানতাম তার সাথে দেখা করিয়ে দেওয়ার জন্য এটা প্রকৃতির একটা সাজানো খেলা!! আচ্ছা, যদি জানতাম, তাহলে কি আমি পালিয়ে চলে আসতাম? কি করতাম আমি বল তো? তুমি তো আমাকে বেশ চেন।

রাস্তাটা পার হয়ে গুলশান মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়েছি আর বৃষ্টির ডাক শুনতে পেলাম। প্রথমে বিশ্বাসই হতে চাচ্ছিল না! বৃষ্টি আমাকে ডাকছে? আমি ওকে এত অবহেলা করার পরেও? আর জানো, আমি না এবার উপেক্ষা করতে পারলাম না! হঠাৎ করেই পাগলটা জেগে উঠল। সামান্যতম চিন্তা করার সুযোগও আমাকে দিল না! ছুটে চলে গেল ওর কাছে।

তারপর অনেকটা পথ আজ হেঁটেছি ওর সাথে। কিন্তু জানো কার কথা ভাবছিলাম তখন? অবিশ্বাস্য!! আমি তোমার কথাই ভাবছিলাম!! কি নিষ্ঠুর রকমের ধোঁকাবাজ আমি! বৃষ্টির সাথে হাঁটছি আর ভাবছি তোমার কথা! কিন্তু কি করব বলো? সারাক্ষন মনে হচ্ছিল, এমন একটা সন্ধ্যা তুমি আমার কাছে অনেক চেয়েছ। কিন্তু না না অজুহাতে আমি তোমায় দেইনি। কিন্তু আজ বৃষ্টি একবার ডাকতেই ওকে দিয়ে দিলাম?

এর ঘন্টা খানেক পরে যখন কাঁপতে কাঁপতে বাসায় ঢুকলাম, তখনো তুমি মাথার ভিতরে। বৃষ্টির স্নিগ্ধ ছোঁয়া সারা গায়ে। কিন্তু তবুও অস্বস্তি… স্যান্ডেলটা পুরোনো হয়ে গেছে। রাস্তার কাঁদা পানিতে চপচপ করছে। তোমার দেওয়া নীল টি-শার্ট টায় হয়ত দাগ পরে যাবে। তোমার দেওয়া ব্যাগটা চুঁইয়ে পানি ধুকেছে ভেতরে। মোবাইলটা ভিজে গেছে। মাথাটা ব্যাথা করছে খুবই।

আচ্ছা বলতো তোমাকে এমন একটা সন্ধ্যা দিলে কি এমন ক্ষতি হত? আসলে এটাই হয়ত ভালোবাসা।

আমি তোমাকে বলেছিলাম, সে আমাকে সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসে। তুমি বলেছিলে, না হতেই পারে না। বৃষ্টি তোমাকে সবচে বেশি ভালবাসে। তোমার কথাই ঠিক জানো? নাহলে সে আসলে শুধু তোমারই কথা কেন মনে করিয়ে দেয়?