শয়তানের ডায়েরি – ১

আজকাল বসে বসেই দিন কাটে। নিজেকে আর কিছুই করতে হয় না। মাঝে মাঝে বিরক্ত লাগলে বাইরে বের হয়ে মানুষের কর্মকান্ড দেখি।

আজ যেমন ঢাকা মেডিকেলের ইমার্জেন্সির গেটে দাঁড়িয়ে আছি প্রায় এক ঘন্টা হলো। অপেক্ষা ব্যাপারটা আমার খুবই অপছন্দ হলেও আজ খারাপ লাগছে না। যদিও বেশিক্ষন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলে লোকজন আড়চোখে তাকাতে শুরু করে। সেজন্য গায়ের আলখেল্লাটাও দায়ী। এই যুগে এমন আলখেল্লা কেউ পড়ে না। সে যাক। আর বেশিক্ষন অপেক্ষা করতে হবে না মনে হচ্ছে। ওইতো একটা এম্বুলেন্স এসে গেছে। পুড়ে বীভৎস হয়ে যাওয়া ২টা লাশ বের হলো ভেতর থেকে। আরও দু’টো এম্বুলেন্স এসে দাঁড়ালো।

ঈশ্বর যেদিন মানুষকে সেরা সৃষ্টি বলে ঘোষনা দিলেন সেদিন ভীষন ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম। তবে এখন বুঝতে পারি মানুষ আসলেই আমার চেয়ে অনেক অনেক বেশি উঁচুদরের সৃষ্টি। নাহলে স্বজাতিকে জ্যান্ত আগুনে পুড়িয়ে আনন্দ করে আর কোন প্রানী?

নেবে কি আমায়?

ধর একটা নদী দিলাম তোমায়,
স্বচ্ছ জলে ছোট ছোট ঢেউ
আর দূরে মাঝির কণ্ঠে গান।
সেই নদীটার পাড় ভাঙ্গে না, শান্ত জলের ধারাকে ঢেকে দায় না কচুরিপানার দল।
সেই নদীটায় পূর্ণিমার ছায়া পড়ে তোমার মন খারাপের রাতে।।

অথবা ধর একটা ঘন বন দিলাম তোমায়,
চারিদিকে শুধুই সবুজ
আর অচেনা পাখির ডাক।
সেই বনে কোন সাপ নেই, নেই কোন চোরা শিকারি।
তোমার আনন্দে ঝলমল দিনে পাতার ফাঁকে শিষ দেয় দুষ্টু কোকিল।।

আর ধর যদি একটা ছোট্ট দ্বীপ দেই,
চারিদিকে শুধুই সবুজ শৈবাল
আর বালিয়াড়ি জুড়ে লাল কাঁকড়ার ছোটাছুটি।
জলোচ্ছ্বাসের ভয় নেই সে দ্বীপে, নেই কোন জলদস্যু।
নারকেল গাছগুলো ছায়া হয়ে থাকে তোমার উদাস দুপুরে।।

অথবা শুধুই একটা কাশবন,
যতদূর চোখ যায় সাদা সাদা কাশফুলে
প্রজাপতি উড়ে বেরায়, লাল নীল হলুদ।
সেই কাশবনে কোন শতপদী নেই, নেই বখাটে ছেলের দল।
প্রজাপতির ডানায় ডানায় তোমার স্বপ্নরা উড়ে বেড়ায় সোনালী বিকেলে।।

নাকি তোমায় আমি একটা নৌকা দেব,
লাল রঙের পাল তোলা
আর চাটাইয়ের ছইয়ের ভেতরে ছায়ার আঁকিবুঁকি?
ভেসে চলে দিগন্তের পথে, মানুষের পৃথিবীর সব অন্ধকারকে পিছনে ফেলে।
জ্যোৎস্না রাতে সেই নৌকায় বসে তুমি নদীর জলে ভাসিয়ে দেবে সব কষ্টগুলো।।

আচ্ছা, আমায় কি নেবে তোমার সাথে?
দুজনে বসে চাঁদের ছায়াটা দেখব নদীর জলে
অথবা পাশাপাশি হেটে যাব সবুজ বনের সরু পথে।
আচ্ছা তোমার দ্বীপের বালিয়াড়িতে যখন লাল কাঁকড়াগুলোকে তাড়া করবে,
আমায় করবে কি তোমার খেলার সাথী?
ধরবে কি আমার হাতটা
সোনালী বিকেলে প্রজাপতি স্বপ্নগুলোকে ভালোবেসে?
আমি কিন্তু তোমার সাথেই থাকব
কষ্টগুলোকে নদীর জলে ভাসিয়ে দেওয়ার সময়।
তুমি আমায় নাও আর নাই নাও
বারবার ফিরে ফিরে তোমাকেই ভালোবাসব।।

ধূসর হতাশাগুলো

১।

শুক্রবার দুপুরে শিশুমেলার কাছে রাস্তা পার হওয়ার সময় থমকে দাঁড়াতে হল। ডিভাইডারের উপরে নোংরায় মাখামাখি হয়ে একটা বাচ্চা ছেলে পড়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছিল মৃত! কত হবে বয়স? ১২ বা ১৩! শরীরে হাড় আর চামড়া ছাড়া কিছু অবশিষ্ট নেই। কি হয়েছিল ছেলেটার? চুরি করতে গিয়ে মার খেয়েছে? কিন্তু তাহলে তো এতক্ষণে পুলিশের নিয়ে যাওয়ার কথা! কাছে গিয়ে বুঝতে পারলাম এখনো বেঁচে আছে। কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে না বেশিক্ষণ থাকবে।

শত শত লোক পার হয়ে যাচ্ছে। জুম্মার নামাজে যাচ্ছে অনেকেই। কিন্তু ফিরেও তাকাচ্ছে না কেউ! এমন নোংরার দিকে তাকলেও সম্ভবত ওযু ভেঙ্গে যাবে। তাই সবাই অন্যদিকে ফিরে জায়গাটা পেরিয়ে যাচ্ছে। বেহেস্তের রাস্তা পরিষ্কার করতে হবে তো!

কেন যেন পারলাম না এড়িয়ে চলে যেতে। ধরে ধরে রাস্তার পাশে নিয়ে বসালাম। এমন পরিস্থিতিতে কি করতে হয় জানা নেই। হেঁটে যাওয়া মানুষদের দৃষ্টি দেখে মনে হল আমাকে এখুনি কোন মানসিক হাসপাতালে পাঠানো দরকার। একটা চা-এর দোকান খোলা পেয়ে সেখান থেকে একটা রুটি আর কলা কিনে নিলাম। সাথে এক বোতল পানি। ১০মিনিট পরে মনে হল এযাত্রা বেঁচে যাবে ছেলেটা। কেমন যেন অবাক একটা চোখে তাকিয়ে থাকল আমার দিকে। আর কি ছিল সেই চোখে? ঘৃণা? এই নষ্ট হয়ে যাওয়া সমাজের প্রতি? সেই দৃষ্টির সামনে বেশিক্ষণ বশে থাকা সম্ভব ছিল না। আরও কিছু বিস্কিট কিনে দিয়ে চলে আসলাম। জানিনা ছেলেটার শেষ পর্যন্ত কি হয়েছিল।

আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু কেন যেন সেই অদ্ভুত দৃষ্টিটা ভুলতে পারি না। দম বন্ধ মনে হয়। কিছু একটা করার জন্য হাসফাস করি।
শিশুদের নিয়ে কাজ করছে এমন কিছু এনজিওর সাইটে ঢুঁ মারি। মাত্র ২০০০ টাকা লাগে একটা ছোট বাচ্চাকে স্পন্সর করতে [, , ]!! অবাক হয়ে ভাবি আর কতদিন লাগবে পথ-শিশু শব্দটাকে অভিধান থেকে বাদ দিতে?

২।
পৃথিবীর সবচেয়ে নাজুক ধর্মানুভূতি সম্ভবত মুসলমানদের। পৃথিবীর আরেক প্রান্তে কেউ হাঁচি দিলেও আমাদের ধর্মানুভূতি আহত হয়।
টিভির খবরে দেখি দাড়িওয়ালা এক ভদ্রলোক বলছেন যে “ইনোসেন্ট মুসলিম” ভিডিওটা না সরানো পর্যন্ত ইউটিউব বাংলাদেশে বন্ধ থাকবে []। পর্দার নিচের দিকে তাকিয়ে দেখতে পাই ইনি আমাদের বিটিআরসি-র চেয়ারম্যান। উনার কথাবার্তা আর জ্ঞানের বহর দেখে অবাক হই। নীতি নির্ধারকদের এই অবস্থা হলে তাঁদের কাছ থেকে এরচেয়ে ভালো কিছু আর আশা করা যায় না। রাস্তায় লাঠি নিয়ে হাঙ্গামা করা মাদ্রাসার ছাত্রদের সাথে উনার একমাত্র পার্থক্য সম্ভবত এই যে উনার একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট আছে।
নিজের ভেতরে শুধুই হতাশা বাড়তে থাকে।

৩।
হঠাৎ করেই শুনতে পাই রামুতে বৌদ্ধদের উপরে হামলা চালিয়ে ঘরবাড়ি, মন্দির সব জ্বালিয়ে দিচ্ছে কিছু ধর্মান্ধ উন্মাদ! খবরের কাগজ আর টিভির রিপোর্ট দেখে কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলি। কি হচ্ছে আমাদের দেশে? কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি। খবরে জানা যায় এই হামলা নাকি পূর্বপরিকল্পিত! ভাবি কি দরকার আমাদের ট্যাক্সের টাকায় এত এত গোয়েন্দা বাহিনী পুষে রাখার?
জানি কিছুই হবে না। আমরা নিউজ চ্যানেল পাল্টে টি২০-এর স্কোর দেখি। মা**** পাকিস্তানিদের ছক্কা হাঁকানো দেখে খুশি হয়ে উঠি। আমরা সভ্য মানুষ হয়ে ওঠার চেষ্টা করি। ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে হলে কিছু অতীত তো বিসর্জন দিতেই হবে তাই না []!

৪।
চট্টগ্রামে হাসপাতালের পাঁচ তলা থেকে রোগীর আত্মীয়কে ফেলে দেয় কর্মচারীরা []। অবাক হই না আর। বুঝে যাই সভ্য মানুষ হতে হলে চোখ বন্ধ করে বাঁচতে শিখতে হবে।

কিছুই ভালো লাগে না। চারিদিক ধূসর মনে হয়। এতেই অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করি। শুধু মাঝে মাঝে খুব দমবন্ধ লাগে। মনে হয় একটু যদি সত্যিকারের মানুষের মত খোলা হাওয়ায় শ্বাস নিতে পারতাম!! অন্তত একটি বার।


পূর্ব প্রকাশ

এই লেখাটা কাশফিয়ার জন্য

আজ হঠাৎ করেই বহুদিন আগের একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। মনে হল যেন বহুযুগ আগের ঘটনা।

কোন একটা কাজে আমি আর সিম্মি আরেক বন্ধু কাশফিয়ার বাসায় গিয়েছি। বিকালের দিকে কাশফিয়াকে একটু বের হতে হবে। সম্ভবত একটা ভোল্টমিটার বা এরকম কিছু কেনার জন্য। ওর সাথে আমিও বের হলাম। হাতিরপুল থেকে হাঁটতে হাঁটতে সায়েন্সল্যাব পর্যন্ত গিয়েও কোন দোকানে পাওয়া গেল না। হাঁটা হাঁটি আর জিনিসটা না পাওয়ায় কাশফিয়ার প্রচন্ড মেজাজ খারাপ। ফিরে আসার জন্য ঘুরেই দেখি একটা ফেরিওয়ালা দারুণ বরই নিয়ে বসে আছে। ব্যস কোন চিন্তা ভাবনা ছাড়াই এক কেজি বরই কিনে ফেললাম।

কিছুক্ষন পর দেখা গেল একটা রিকশায় একটা ছেলে আর একটা মেয়ে বসে আছে। মেয়েটা প্রচন্ড মেজাজ খারাপ করে একটা বিশাল কাগজের প্যাকেট ধরে আছে, আর ছেলেটা মহা আনন্দে পা নাচাচ্ছে আর প্যাকেট থেকে একটা একটা করে বরই বের করে মুখে ফেলছে। মেয়েটা মাঝে মাঝে খুবই বিরক্ত চোখে ছেলেটার দিকে তাকাচ্ছে।

দৃশ্যটা নিশ্চই খুবই হাস্যকর ছিল!!

Miss you সোনাপাখি, my dearest ‘ex’-best friend (এই নামটাও তোরই দেওয়া)। Miss all the fun, the gang, the 29 game, the fights… miss the good old days…

মেয়ে

মেয়ে

মেয়ে তুমি চুপ কেন?
মেয়ে তুমি কি ভাব? /
কোথায় হারাও? /
মেয়ে তুমি হাস কি? /
ভালবাস কি ঘাসফড়িং? /
শিশির ভেজা কচি পাতায় /
প্রজাপতির নাচন? /
মেয়ে তুমি কি গান গাও? /
কবিতা পড় কি? /
নাকি কবিতার নায়িকা হয়েই /
তোমার সব সুখ? /
তুমি কি স্বপ্ন দেখ মেয়ে? /
শান্ত নদীর পাড়, ঘাসের গালিচা আর /
একটি ঝাকড়া অশ্বত্থ গাছ? /
মেয়ে তুমি কেন কাঁদ? /
চোখের জলে কেন ভাসাও /
দুঃখের নৌকা? /

মেয়ে তুমি উচ্ছল /
চঞ্চল চপল জীবনে ভরপুর। /
তুমি আনন্দের শোভাযাত্রা। /
মেয়ে তুমি স্বর্গলোকের রাজকন্যা /
চোখের ইশারায় /
সকাল থেকে সন্ধ্যা নামাও। /
স্বপ্নেই শুধু ধরা দাও মেয়ে /
দিনের সকল ক্লান্তি শেষে /
ছড়িয়ে দাও আলতো ভালবাসা। /
সাদাকালো স্বপ্নগুলো /
রঙিন করে দাও।।