একটি প্রেমের কবিতা

আমি একটি প্রেমের কবিতা লিখতে চেয়েছিলাম,
কবিতাটা নিজে থেকেই হতাশা আর
আক্ষেপের কথা বলতে থাকে।
ঝকঝকে সাদা অফসেটে
আমি ভালবাসার কথা লিখতে চেয়েছিলাম,
কিন্তু কাগজটা হয়ে যায় ক্ষোভে নীল
ঘাস মেঘ ফুল আকাশ সবই রক্তাক্ত লাল।

আমি একটা কবিতা লিখতে চেয়েছিলাম,
কবিতায় প্রকৃতি থাকবে
বৃষ্টি নদী পাখি আর তারারা থাকবে
কিন্তু কবিতার শব্দগুলো অজান্তেই এলোমেলো
তোমায় নিয়ে কবিতাটা শুধুই অন্যরকম হয়ে যায়।
কবিতাটা অভিজিৎ বলে চিৎকার করে ওঠে
প্রতিধ্বনি হয় – অনন্ত ওয়াশিকুর।

আমি শুধুই ভালবাসি বলতে চেয়েছিলাম
শব্দের ছন্দে প্রকৃতি মিশিয়ে প্রিয়তমার স্তুতি।
কিন্তু প্রেম আজ ভীত স্থবির
ভালবাসা কুন্ঠিত বিবর্তনের উল্টো স্রোতে,
কবিতা তাই আজ নিজেই সোচ্চার,
প্রতিবাদী হয়ে
আমার অক্ষমতার লজ্জা ঢাকে।

Shimmi

লক্ষী মেয়েটা কে শুভকামনা

জীবনে দিন দিন ব্যস্ততা বাড়তে থাকে আর সম্পর্কগুলো ফিকে হয়ে যায়। স্বার্থপরের মত সবকিছুই হয়ে যায় আমিময়।  গভীর বন্ধুত্বগুলো শুধুই “কিরে কেমন আছিস” -এ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। মাঝে মাঝে অলস সময়ে স্মৃতিগুলো শুধু একটু জ্বালা যন্ত্রণা করে। তারপরে আবারও আমি আমি আমি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়টুকু সত্যিই অসাধারণ ছিল। আর তার কারণ অসাধারণ কিছু বন্ধু। সেই কাছের বন্ধুদের একজনকেই আজকের এই লেখাটুকু।

আমরা ক্লাস শুরুর ২-৩ দিন পরে পিচ্চি একটা মেয়ে ক্লাসে এসে হাজির। কোনও একটা উদ্ভট কারণে আমাদের ক্লাসে ছেলে এবং মেয়েরা আলাদা সারিতে বসত প্রথম দিন থেকেই (এর জন্য সম্ভবত রুবীর বোরখা দায়ী)। সে যাই হোক, আলাদা বসলেও কিভাবে কিভাবে যেন ক্লাসের এক মাথা থেকে আরেক মাথায় সব ইনফরমেশনগুলো পাস হয়ে যেত। মেয়েটা ক্লাসে আসার কয়েক মিনিটের মধ্যেই জানতে পারলাম সে খেলোয়াড় হিসেবে আমাদের ডিপার্টমেন্টে জয়েন করেছে। আর সে কারণেই ২-৩ দিন দেরি। স্বভাবতই ক্লাসের সবচেয়ে শেষ রোল নাম্বারটা তাকে এসাইন করা হলো – ৬৬। আমার রোল নাম্বার ছিল ৩৩। বেশ মজাই লাগলো। প্রথম দিন ভাবছিলাম মাথার পেছনে ছোট্ট পনিটেইল করা এই পিচ্চি মেয়েটা কি খেলতে পারে! কয়েকদিন পরেই আবিষ্কার করলাম এই মেয়েটা তুখোড় দাবাড়ু। সিম্মি জয়েন করেই কিভাবে যেন কাশফিয়ার সাথে ভিড়ে গেল। সিম্মির নামের উচ্চারণ কিন্তু শিম্মি কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পুরোটা সময় ভুল বানানে আর ভুল উচ্চারণে ওর নাম সিম্মি বলে খেপাতাম।

কিছুদিন পরেই আবিষ্কার করলাম এই মেয়েটা শুধু দাবায় না, লেখাপড়ায়ও তুখোড়। আমাদের সময় যখন হারিকেন দিয়ে খুঁজেও ২-১ জন এ+ পাওয়া যেত না সেই সময় এই মেয়েটা ইংরেজীতে এ+ পেয়েছিল! ফার্স্ট ইয়ার ফাইনালে সিম্মির কল্যানেই কিভাবে যেন মোটামুটি ভাল রেজাল্ট করে ফেললাম।

সিম্মির একটা নিক নেম ছিল আমাদের বন্ধুদের মধ্যে – “লক্ষী মেয়ে”। প্রতিদিনই ক্লাস শেষ হওয়ার সাথে সাথেই যখন আমরা আড্ডাবাজী বা ২৯ খেলতে বসতাম সিম্মি বলতো – “বাসায় যাব”। লক্ষী মেয়ে নামের কারণ এটাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে সেকেন্ড ইয়ারে উঠার পরে সবার মধ্যেই একটা প্রেম প্রেম ভাব আসে। তখন প্রেম করাটা মোটামুটি রুটিন ব্যপার। দেখা গেল আমাদের বন্ধুদের গ্রুপের সবাই প্রেম করে ফেলেছে শুধু আমি, সিম্মি আর অতুল বাকি। অতুল বেচারা একটু মুখচোরা হওয়ায় বাকিরা আমাকে আর সিম্মিকে বেশ খেপানোর চেষ্টা করতো। আর “লক্ষী মেয়ে” সিম্মি যে কোনও উপায়ে এই ক্ষেপানো থেকে বাঁচার উপায় খুঁজতো। একদিন দুপুরে মেডিকেল থেকে লাঞ্চ করে রিকশায় ফিরছি এমন সময় ঝুম বৃষ্টি। রিকশায় হুড তুলে বসলে সবাই আবার ক্ষেপাবে এই যুক্তিতে দুইজন রিকশায় হুড খুলে বৃষ্টি বিলাস করতে করতে কাক ভেজা হয়ে ক্লাসে ফিরলাম! একমাত্র লেখাপড়া ছাড়া আর সব বিষয়েই সিম্মির যুক্তিগুলো এরকম অদ্ভুতই ছিল। এমন অদ্ভুত মেয়েটা কিভাবে যে এত ভাল দাবা খেলে সেটা আমার মাথায় ঢুকে না।

মাঝে মাঝেই ক্লাস শেষ হওয়ার সাথে সাথে সিম্মি দৌড় দিত দাবা ফেডারেশনে খেলার জন্য। কোনও কোনও দিন আমি যেতাম খেলা দেখতে। দুঃখের বিষয় যেদিনই আমি যেতাম সেদিনই ও হেরে যেত! আমি গেলেই সম্ভবত “কুফা” লেগে যেত। এই কারণে কিছুদিন পর থেকে সিম্মির খেলা থাকলে আমি দাবা ফেডারেশনের আশে পাশে যাওয়াই বন্ধ করে দিলাম। লক্ষী মেয়েটা বেশ সেলিব্রিটি খেলোয়াড় হয়ে গেছে। আর আমিময় আমার বেশ গর্ব লাগছে মেয়েটাকে আমার বন্ধু বলতে পেরে। অনেক শুভকামনা তোর জন্য।

মন ভাল হোক

কেন হঠাৎ তুমি এলে?

প্রচন্ড আনন্দ বা তীব্র মন খারাপের মুহূর্তে হঠাৎই মুঠোফোন হাতে নেই। পরিচিত সংখ্যাগুলো ছুয়ে দেই তোমার খোঁজে। মহাকালের মাঝে খুবই ক্ষুদ্র এই জীবনে আরও ক্ষুদ্রতম সময়ের জন্য কেনই বা এলে তুমি? চলেই যদি যাবে তবে স্বপ্ন দেখানোর কি কোনও প্রয়োজন ছিল? দুঃখ বা আনন্দের বোধগুলো দিন দিন ভোঁতা হয়ে আসে। শুধুই অবাক হই অপরিচিত অনুভূতিতে।

ধুলো জমা কবিতার বইগুলো আর ডাকে না। ইউটিউবের প্লেলিস্টে গানগুলো জমেই থাকে। অবাক হয়ে দেখি অনুভূতিহীন সময়ের এগিয়ে চলা। আজকাল ঘড়িগুলোও নিঃশব্দ। মুহূর্তগুলো পেরিয়ে যাওয়ার সময় টিক টিক শব্দ করে না আর। হারিয়ে যাওয়ার পথগুলোও হারিয়ে যায় ধূসর কুয়াশায়। পথগুলো খুঁজতে খুঁজতে চোখের দৃষ্টি ঘোলা হয়ে আসে। অনুভূতিহীন বোধে আনন্দ বা দুঃখ আসে না। শুধুই ঘোলা চোখে কুয়াশায় ঢাকা পথগুলো আরও দুর্ভেদ্য মনে হয়।

আসলেই যদি তবে থাকলে না কেন পুরোটা জুড়ে?

 

আকাশের মন ভাল নেই

একদিন দিনশেষে তুমি আমার নও

– হ্যালো! এখনো ঘুমাও নি?
– নাহ। তোমাকে ছাড়া ঘুম আসে না।
– পাগলী কোথাকার। এখন চোখ বন্ধ কর তো। আমি ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছি।

রাত বেড়ে চলে। একটা একটা করে মিনিট পার হয়ে ঘণ্টা। তোমার ভারী হয়ে আসা নিঃশ্বাসের শব্দ শুনি। জেগে থেকে স্বপ্ন বুনি। রাত গভীর হয়। তারাগুলো জ্বলজ্বল করে। মনে হয় হাত বাড়ালেই ধরা দেবে। নানান রঙ্গে স্বপ্নগুলোকে সাজাই।

– এই শুনো না, আমার ফেসবুকের প্রোফাইল পিকটা চেঞ্জ করে দাও তো।
– তুমি করতে পার না?
– আমার এই সব খুব ঝামেলা লাগে। তুমি করে দাও। আর আমার সব ছবি তো তোমার ক্যামেরাতেই। সেখান থেকে খুব সুন্দর একটা দিয়ে দাও।

দিন রাত ফেসবুকে অনলাইন হয়ে বসে থাকি, কখন তুমি আসবে। হয়তো শুধু কয়েক মিনিটের জন্য। হোক না। তবুও যদি আমাকে খুঁজে না পাও?

– এই শুনো না। সরি। আর হবে না এমন। এই নাও এখন একটা হাসি দিলাম তো। এখন রাগ দূর কর প্লীজ।
– হুম। খুব পাজি তুমি। জানো হাসি দিলে আর রাগ করে থাকতে পারব না।
– হি হি। জানিই তো। আমার বুদ্ধি বেশি না?

খুনসুটিতে সময় বেড়ে চলে। লেকের পাড়ে বাদাম ওয়ালা একটু খানি ঝাল লবণ দিয়ে এক ঠোঙা বাদাম দেয়। বাদামের রঙিন খোসাগুলো বাতাসে ওড়ে। বিকেল পেড়িয়ে সন্ধ্যা হয়। দূরের জটলায় ছেলের দল গিটার বাজিয়ে গান ধরে।

সোনার মেয়ে তোমায় দিলাম ভুবন ডাঙ্গার হাসি /
তোমায় দিলাম মধ্য দিনের টিনের চালের বৃষ্টি রাশি /
আরও দিলাম রৌদ্র ধোয়া, সবুজ ছোঁয়া পাতার বাঁশি /
মুখে বললাম না, বললাম না রে ভালবাসি /

– শুনো না। তুমি আমাকে আরেকটা নতুন ফোন কিনে দাও তো। এটায় সবসময় সবাই ফোন করে। আর রাতের বেলা ওয়েটিং দেখলে খালি প্রশ্ন করে।
– যো হুকুম মহারানী। কালই পেয়ে যাবেন।
– ধ্যাৎ খালি দুষ্টামি। শুনো। এটা হবে শুধুই আমাদের কথা বলার জন্য। এই নাম্বার আর কাউকে দেব না।
– আচ্ছা।

কত কথা, কত গল্প, কত নিরর্থক তর্ক ঝগড়া সারা দিন জুড়ে। নৈঃশব্দগুলো প্রচণ্ড ভারী পাথরের মত মনে হয়। চারপাশ থেকে থিকথিকে জেলির মত চেপে ধরে দম বন্ধ করে দিতে চায়।

– এই, তুমি আমাকে এত ভালবাস কেন?
– কই? আমার তো মনে হয় যথেষ্ট ভালবাসতে পারি না। আরও অনেক অনেক অনেক বেশি ভালবাসতে ইচ্ছা হয় তোমাকে।
– ধ্যাৎ। খালি বেশি বেশি নাটুকে কথা বার্তা। এভাবে ভালবাসলে কষ্ট ও বেশি পেতে হয় জানো না?
– তুমি পাশে থাকলে কষ্ট কোথা থেকে আসবে?
– তুমি এত বোকা কেন? বাদ দাও। তুমি বুঝবে না। শুনো, কাল সারাদিন কথা বলতে পারবো না, বাসায় মেহমান আসবে।
– হায়! তাহলে আমার কি হবে!

সারাদিনে ফোন টা বাজে না একবারও। খুবই ব্যস্ত বুঝি? আমি কবিতার বই হাতে বারান্দায় বসে থাকি। শ্রীকান্ত গেয়ে চলে

আমি এত যে তোমায় ভালবেসেছি /
তবু মনে হয় এ যেন গো কিছু নয় /
কেন আরও ভালবেসে যেতে পারে না হৃদয়? /

– “আপনি যে নম্বরটিতে ফোন করেছেন তা এই মুহূর্তে ব্যস্ত আছে। অনুগ্রহ করে কিছুক্ষণ পরে আবার চেষ্টা করুন। ধন্যবাদ। দ্যা নাম্বার ইউ আর …”

যান্ত্রিক কণ্ঠ অবিশ্রান্ত ভাবে তোমার ব্যস্ততার জানান দিয়ে যায়। মিনিট থেকে ঘণ্টা পার হয়ে দিন যায়। ব্যস্ততা বেড়ে চলে।

– হ্যালো।
– হুম বল। এত ফোন দিচ্ছ কেন। দেখছ না ওয়েটিং?
– না আসলে সারাদিন কথা হয়নি তো তাই।
– ব্যস্ত ছিলাম অনেক। এখন খুবই টায়ার্ড লাগছে। ঘুমিয়ে পড়ি। তুমিও ঘুমাও। রাখছি। গুড নাইট।

শুভ হোক তোমার রাত্রি। আমি আজও জেগে থেকে স্বপ্ন বুনি।

অপেক্ষার প্রহরগুলো বড় হয়। দিনগুলো একটু একটু করে দীর্ঘতর হয় প্রতিদিন। লেকের জলে বাদামের লালচে খোসা ভেসে যায়। কবিতার বইগুলোতে ধুলো জমে। শ্রীকান্ত গেয়ে যায়, তবুও চারিদিকে আঠালো নৈঃশব্দ। স্বপ্নগুলো ঘোলাটে হতে হতে হারিয়ে যায়। মোবাইল ফোনে যান্ত্রিক কণ্ঠ ব্যস্ততার অজুহাত দিতেই থাকে। রাত গভীর হয়, তারাগুলো আরও দূরে সরে সরে যেতে থাকে।

ফেসবুকে নোটিফিকেশন আসে “মেঘবালিকা তার প্রতিকৃতি বদল করেছেন”।