এই শহরে বসন্ত এসেছে

কংক্রিটের ফাঁকে ফাঁকে অযত্নে বেড়ে ওঠা
বেয়াড়া সবুজ ধুলায় ধূসর,
নতুন মুকুলে ভরে আছে আমের শাখারা –
তবু ঘ্রাণ ছড়ায় না,
বিদ্যুতের তার জুড়ে সারি বাঁধা কাকের
দৃষ্টিতে আস্তাকুঁড়।

শহরটা মৃত্যু যন্ত্রণায় একই রকম গোমরায় –
ব্যস্ততার ভেঁপু, অসহিষ্ণু পথিকের আস্ফালন,
বস্তির গলি থেকে ভেসে আসা খিস্তিতে।
এই শহরে আজ বসন্ত এসেছে।

ফুলের আড়তদার বেলির বদলে
গাঁদার ঝুড়ি নামায়,
রঙ জ্বলে যাওয়া হলুদ পাঞ্জাবীর
এক বালক মালা কেনে
সদ্য কৈশোরের প্রথম শাড়ি পরা
কোনও বালিকার জন্য।

চৈত্রের রোদে শাহবাগের রাস্তায়
দ্বিগুণ দামে কুলফি কেনে ভীরু প্রেমিক,
ঘামে ভিজে রিকশা খোঁজে মরিয়া হয়ে।
এই শহরে আজ বসন্ত এসেছে।

আমি বরং অপেক্ষায় থাকি আগামী বর্ষার,
হাঁটু জলে ডুবে যাবে মিরপুর থেকে পল্টন,
হুড-তোলা রিকশায় জড়সড় প্রেম,
ধূসর ধুলো ঝেড়ে ফুটপাথের মৃতপ্রায় ঝাউঝোপ আবার সতেজ,
জানালার কার্নিশে চুপসানো চড়ুই
আর অজানা গলি থেকে কদমের উন্মাদ গন্ধ।

শ্যাওলা ধরা ভাঙা দেয়ালে বসে
সেদিন আমি বরং দেখবো
বৃষ্টি স্নানে এই বেজন্মা শহরটাকেও
কেমন পবিত্র মনে হয়।

একটি প্রেমের কবিতা

আমি একটি প্রেমের কবিতা লিখতে চেয়েছিলাম,
কবিতাটা নিজে থেকেই হতাশা আর
আক্ষেপের কথা বলতে থাকে।
ঝকঝকে সাদা অফসেটে
আমি ভালবাসার কথা লিখতে চেয়েছিলাম,
কিন্তু কাগজটা হয়ে যায় ক্ষোভে নীল
ঘাস মেঘ ফুল আকাশ সবই রক্তাক্ত লাল।

আমি একটা কবিতা লিখতে চেয়েছিলাম,
কবিতায় প্রকৃতি থাকবে
বৃষ্টি নদী পাখি আর তারারা থাকবে
কিন্তু কবিতার শব্দগুলো অজান্তেই এলোমেলো
তোমায় নিয়ে কবিতাটা শুধুই অন্যরকম হয়ে যায়।
কবিতাটা অভিজিৎ বলে চিৎকার করে ওঠে
প্রতিধ্বনি হয় – অনন্ত ওয়াশিকুর।

আমি শুধুই ভালবাসি বলতে চেয়েছিলাম
শব্দের ছন্দে প্রকৃতি মিশিয়ে প্রিয়তমার স্তুতি।
কিন্তু প্রেম আজ ভীত স্থবির
ভালবাসা কুন্ঠিত বিবর্তনের উল্টো স্রোতে,
কবিতা তাই আজ নিজেই সোচ্চার,
প্রতিবাদী হয়ে
আমার অক্ষমতার লজ্জা ঢাকে।

নেবে কি আমায়?

ধর একটা নদী দিলাম তোমায়,
স্বচ্ছ জলে ছোট ছোট ঢেউ
আর দূরে মাঝির কণ্ঠে গান।
সেই নদীটার পাড় ভাঙ্গে না, শান্ত জলের ধারাকে ঢেকে দায় না কচুরিপানার দল।
সেই নদীটায় পূর্ণিমার ছায়া পড়ে তোমার মন খারাপের রাতে।।

অথবা ধর একটা ঘন বন দিলাম তোমায়,
চারিদিকে শুধুই সবুজ
আর অচেনা পাখির ডাক।
সেই বনে কোন সাপ নেই, নেই কোন চোরা শিকারি।
তোমার আনন্দে ঝলমল দিনে পাতার ফাঁকে শিষ দেয় দুষ্টু কোকিল।।

আর ধর যদি একটা ছোট্ট দ্বীপ দেই,
চারিদিকে শুধুই সবুজ শৈবাল
আর বালিয়াড়ি জুড়ে লাল কাঁকড়ার ছোটাছুটি।
জলোচ্ছ্বাসের ভয় নেই সে দ্বীপে, নেই কোন জলদস্যু।
নারকেল গাছগুলো ছায়া হয়ে থাকে তোমার উদাস দুপুরে।।

অথবা শুধুই একটা কাশবন,
যতদূর চোখ যায় সাদা সাদা কাশফুলে
প্রজাপতি উড়ে বেরায়, লাল নীল হলুদ।
সেই কাশবনে কোন শতপদী নেই, নেই বখাটে ছেলের দল।
প্রজাপতির ডানায় ডানায় তোমার স্বপ্নরা উড়ে বেড়ায় সোনালী বিকেলে।।

নাকি তোমায় আমি একটা নৌকা দেব,
লাল রঙের পাল তোলা
আর চাটাইয়ের ছইয়ের ভেতরে ছায়ার আঁকিবুঁকি?
ভেসে চলে দিগন্তের পথে, মানুষের পৃথিবীর সব অন্ধকারকে পিছনে ফেলে।
জ্যোৎস্না রাতে সেই নৌকায় বসে তুমি নদীর জলে ভাসিয়ে দেবে সব কষ্টগুলো।।

আচ্ছা, আমায় কি নেবে তোমার সাথে?
দুজনে বসে চাঁদের ছায়াটা দেখব নদীর জলে
অথবা পাশাপাশি হেটে যাব সবুজ বনের সরু পথে।
আচ্ছা তোমার দ্বীপের বালিয়াড়িতে যখন লাল কাঁকড়াগুলোকে তাড়া করবে,
আমায় করবে কি তোমার খেলার সাথী?
ধরবে কি আমার হাতটা
সোনালী বিকেলে প্রজাপতি স্বপ্নগুলোকে ভালোবেসে?
আমি কিন্তু তোমার সাথেই থাকব
কষ্টগুলোকে নদীর জলে ভাসিয়ে দেওয়ার সময়।
তুমি আমায় নাও আর নাই নাও
বারবার ফিরে ফিরে তোমাকেই ভালোবাসব।।

মেয়ে

মেয়ে

মেয়ে তুমি চুপ কেন?
মেয়ে তুমি কি ভাব? /
কোথায় হারাও? /
মেয়ে তুমি হাস কি? /
ভালবাস কি ঘাসফড়িং? /
শিশির ভেজা কচি পাতায় /
প্রজাপতির নাচন? /
মেয়ে তুমি কি গান গাও? /
কবিতা পড় কি? /
নাকি কবিতার নায়িকা হয়েই /
তোমার সব সুখ? /
তুমি কি স্বপ্ন দেখ মেয়ে? /
শান্ত নদীর পাড়, ঘাসের গালিচা আর /
একটি ঝাকড়া অশ্বত্থ গাছ? /
মেয়ে তুমি কেন কাঁদ? /
চোখের জলে কেন ভাসাও /
দুঃখের নৌকা? /

মেয়ে তুমি উচ্ছল /
চঞ্চল চপল জীবনে ভরপুর। /
তুমি আনন্দের শোভাযাত্রা। /
মেয়ে তুমি স্বর্গলোকের রাজকন্যা /
চোখের ইশারায় /
সকাল থেকে সন্ধ্যা নামাও। /
স্বপ্নেই শুধু ধরা দাও মেয়ে /
দিনের সকল ক্লান্তি শেষে /
ছড়িয়ে দাও আলতো ভালবাসা। /
সাদাকালো স্বপ্নগুলো /
রঙিন করে দাও।।

আমায় ছুটি দাও

আমায় ছুটি দাও

আমায় ছুটি দাও সবুজ মেঘের দল /
আমি মহামানব হতে চাই না /
কালের গর্ভে করতে চাইনা জ্বলজ্বলে রেখাপাত /
চাইনা কোন অসামান্য অতিমানবীয় কীর্তি /
আমি খুব সাধারণ মানুষ হতে চাই।

প্রিয় মানুষগুলোর দুঃস্বপ্নগুলোকে ভাগ করতে চাই /
ধরে রাখতে চাই প্রিয় মূহুর্তগুলোকে /
কষ্ট পেলে চিৎকার করে কাঁদতে চাই /
সবকিছু তছনছ করে দিতে চাই রাগে দুঃখে ক্ষোভে /
স্বার্থপর হতে চাই /
আত্মকেন্দ্রিক হতে চাই /
শুধু ভালবাসার মানুষগুলোকে নিয়ে ভাল থাকতে চাই।

আমায় ছুটি দাও সবুজ মেঘের দল /
আমি আত্মত্যাগের মশাল হতে চাই না /
আমি একজন সাধারণ মানুষ হতে চাই।।